প্রকাশিত: ১৩/০১/২০২০ ৮:৫৫ পিএম

এইচ এম এরশাদ কক্সবাজার থেকে::
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে না দেখে স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। গত ২০১৮-১৯ দুই বছরে ২ বার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েও একজন রোহিঙ্গাকে দেশে ফেরত পাঠানো যায়নি। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে ধীরগতি অবস্থা দেখে স্থানীয়দের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলে কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রেখেছে সরকার।

সূত্র জানায়, প্রায় আড়াই বছর আগে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের থাকার জায়গা দিতে গিয়ে অনেকে হারিয়েছেন তাদের বসতভিটা। হারিয়েছে তাদের চাষের জমিজমাও। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত না হওয়ায় তারা তাদের সেই আবাদী জমি সহসাই ফেরত পাবেন কিনা- সকলের মনে সেই সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে। ১২ লাখ রোহিঙ্গার বসতবাড়ি নির্মাণে বনভূমি কেটে সাফ করা হয়েছে। নির্বিচারে কাটা হয়েছে অর্ধশতাধিক পাহাড়-টিলা। পাহাড়ের ওই মাটি পার্শ্ববর্তী খাল বিলে গিয়ে পড়েছে। উখিয়া টেকনাফের ওই খালবিল নাব্য হারিয়েছে। তাতেও ক্ষতির ভাগটা কেবল স্থানীয়দেরই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নতুবা জনবিচ্ছিন্ন কোন দ্বীপ ও পরিত্যক্ত স্থানে সরানো ছাড়া দু:খ দূর হবেনা স্থানীয়দের।

সরেজমিনে একাধিক ক্যাম্পের আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের শিবিরে বর্তমানে প্রায় আড়াই বছর পার হয়েছে। কখন নিজ দেশে ফিরে যাবে, তা তারা নিজেরাও জানেনা। তবে তারা এটাই বলছেন, যখন মিয়ানমার সরকার তাদের দাবি পূরণ করবে, তখন তাদেরকে ফিরে যেতে বলবে রোহিঙ্গা নেতারা। নেতা কারা? এমন প্রশ্নের উত্তরে রোহিঙ্গারা জানায়, রাতে এলে দেখবেন, অস্ত্র হাতে মুখোশ পরে বার্মায় ফিরে না যাবার জন্য চাপ প্রয়োগ করে ঘুরে বেড়ায় তারা। প্রত্যাবর্তনে আগ্রহী বলে শুনলেই অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় ওই রোহিঙ্গাকে। ক্যাম্প ছাড়াও চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে স্থায়ীভাবে দালান গড়ে দিব্যি বসবাস করছে বহু পুরনো রোহিঙ্গা নেতা। তারাও গোপনে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে বলে জানা গেছে। উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি ক্যাম্পে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গারা নেতা নির্ভরশীল হওয়ায় তথা অস্ত্রধারী ওইসব নেতাদের অর্ডার না পাওয়ায় এ পর্যন্ত কোন রোহিঙ্গা তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যাবার আগ্রহ দেখায়নি। প্রথম দিকে রোহিঙ্গাদের প্রতি স্থানীয় লোকদের যে মনোভাব ছিল, ২ বছর ৫ মাস পরে উভয়ের মনোভাবে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এই পরিবর্তন? স্থানীয় লোকজন মনে করেন, রোহিঙ্গা আগমনের ফলে তারা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পরিবেশ প্রতিবেশ থেকে শুরু করে নিজ দেশে স্বাধীনভাবে যাতায়াতেও তারা বিভিন্নভাবে হেনস্তা হচ্ছেন। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকে উখিয়া টেকনাফ এলাকায় চুরি, ডাকাতি, খুন ইয়াবা-মাদক কারবার বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মূল কারণ হিসেবে জনসংখ্যাধিক্য ও রোহিঙ্গা ডাকাতদের দায়ী করা যায়। বর্তমানে উখিয়া টেকনাফ ২টি উপজেলার স্থানীয় লোকসংখ্যা সোয়া পাঁচ লাখ, আর রোহিঙ্গারা তার প্রায় দ্বিগুণ। স্বাভাবিকভাবে একটা ছোট এলাকায় এত লোকসংখ্যা আইনশৃঙ্খলা অবনতির জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। গত ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা ডাকাতরা টেকনাফে হ্নীলার স্থানীয় যুবক ওমর ফারুক হত্যা, একই বছরের ২০ অক্টোবর টেকনাফ শাপলাপুর এলাকা থেকে ২ কিশোরী (ছাত্রী) অপহরণসহ নানান ঘটনায় বিষিয়ে তুলেছে স্থানীয়দের। এ কারণে স্থানীয়দের মনে রোহিঙ্গা আতঙ্ক দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব মাদক কারবারি মিয়ানমারে থাকতে ইয়াবা কারবার করত, তাদের বড় একটা অংশ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছে। বর্তমানে ওইসব রোহিঙ্গা তাদের সেই অবৈধ কারবার বিস্তার ঘটাচ্ছে ক্যাম্পে। আনছে প্রতিনিয়ত ইয়াবার চালান।

রোহিঙ্গা আগমনে তাদের মৌলিক মানবিক সেবাকর্মে কিছু সংখ্যক স্থানীয়দের চাকরি হলেও এলাকার শ্রমিকরা হয়ে পড়ছেন বেকার। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেমন স্থানীয় শ্রমিকরা কাজের সুযোগ পান না। অন্যদিকে রোহিঙ্গা শ্রমিকরা তুলনামূলক সস্তায় শ্রম বিক্রি করায় স্থানীয় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ছেন। তারা বর্তমানে তাদের দৈনন্দিন সাংসারিক খরচ চালাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। একদিকে বেকারত্ব অন্যদিকে নিত্যপণ্যের উর্ধগতি। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। বর্তমানে সবজি মৌসুমেও এই এলাকায় সবজির দাম অন্য এলাকার তুলনায় ঢের বেশি। মাছ মাংস সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমানা ছাড়িয়েছে।

উখিয়ার পালংখালীর বাসিন্দা মানবাধিকার কর্মী জিয়াউর রহমান মুকুল বলেন, ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট থেকে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী ক্যাম্প এখন উখিয়ার কুতুপালংয়ে। বাংলাদেশ জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে সক্ষম হয়েছে। কেবল আশ্রয় প্রদানে ক্ষান্ত না হয়ে তাদের জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থাও করে যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। মানবিকতার চূড়ান্ত উদাহরণ এর বেশি আর কী হতে পারে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী মাদার অব হিউমিনিটি উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু মিয়ানমার বিশ্বের বুকে পরিচিতি লাভ করেছে বিতাড়ক রাষ্ট্র হিসেবে। সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী দেশ হিসেবে। নোবেল বিজয়ী আউং সান সুচি হয়েছেন বিশ্ব নিন্দিত।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিনামারের নিষ্ঠুরতা নতুন নয়। বিগত কয়েকদশক ধরে রাখাইন অঞ্চলে সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠীর উপর চরম নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বারংবার পার পেলেও এই বারই প্রথম আইন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় মিয়ানমারকে। ২০১৭ সালে রাখাইেেন রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে)। এর এই ঘটনায় বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আফ্রিকার ছোট্ট দেশ গাম্বিয়া। কুশীলব হিসেবে ছিলেন দেশটির এ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবু বকর মারি তামবাদু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মামাদু। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এর ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসের ২২ তারিখে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর ২য় উদ্যোগ নেয়া হলেও অনিবার্য কারণবশত তা আর সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়বারে তিন হাজার চারশ’ পঞ্চাশজনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কেউ ফিরে যেতে রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১৫ নবেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ১ম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এর পর থেকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন মহলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি জন আলোচনায় চলে আসে। একেক মহল একেকভাবে এ সমস্যা উত্তরণের ফর্মূলা দিচ্ছেন। রোহিঙ্গা আশ্রয় পরবর্তী ঘটনাবলীর মধ্যে ২০১৯ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলীর একটি হলো রোহিঙ্গা কর্তৃক আয়োজিত ২৫ আগস্টের মহাসমাবেশ। রোহিঙ্গা বিতাড়নের ২য় বর্ষফূর্তি উদযাপন উপলক্ষে ক্যাম্প এলাকায় এই মহাসমাবেশ আয়োজন করে আশ্রিত রোহিঙ্গারা।

২০১৭ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে)। এর এই ঘটনায় বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আফ্রিকার ছোট্ট দেশ গাম্বিয়া। কুশীলব হিসেবে ছিলেন দেশটির এ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবু বকর মারি তামবাদু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মামাদু। ইসলামিক সহযোগিতার (সংস্থা) ওআইসি ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য।

সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যু দ্রুত সমাধানকল্পে ৪টি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রথম প্রস্তাবে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন এবং আত্তীকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে।’ দ্বিতীয় প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের আয়োজন করতে হবে।’ তৃতীয় প্রস্তাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের মাধ্যমে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী চতুর্থ প্রস্তাবে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণসমূহ বিবেচনায় আনতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

পাঠকের মতামত

জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে সুযোগ পেলেন কক্সবাজারের ইয়াশনা

​চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্রী ইয়াশনা ইকতার জাপানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ...

বিলাসবহুল গাড়ি, তরুণ সিন্ডিকেট ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে বিস্তৃত ইয়াবা নেটওয়ার্ক

কখনো বিলাসবহুল প্রাইভেটকার, কখনো সুন্দরী নারী, কখনো পেটের ভেতর, কখনো শরীরের বিভিন্ন অংশে, আবার কখনো ...
Single Page Footer